fbpx
রোমান কংক্রিট

কংক্রিট তৈরির সেকাল একাল

Spread the love

Last Updated on August 13, 2021 by Engineers

কংক্রিট তৈরির সেকাল একাল

কংক্রিট তৈরির সেকাল একাল – আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন গুহাবাসি। সভ্যতার ক্রমবিকাশে আজ আমাদের বসবাসের জন্য রয়েছে আস্ত শহর। যেখানে আবাসনের জন্য আছে আলিশান ফ্ল্যার্ট-আপার্টমেন্ট,কাজের জন্য বিশেষায়িত অফিস,চিত্ত বিনোদনের জন্য নির্মাণ করেছি মোটেল-হোটেল, সিনেপ্লেক্স, পার্ক ইত্যাদি।যোগাযোগ মাধ্যম দ্রুত ও ত্বরান্বিত করার জন্য প্রমত্ত নদীর বুক চিরে তৈরি করেছি প্রকৌশল বিস্ময় ব্রীজ,শহরে তৈরি করেছি উড়াল সড়ক,মেট্রোরেলের জন্য বিশেষ লেন। আরও কত কি! এই এতসব অবকাঠামো বা স্থাপনার মূলে আছে-কংক্রিট।

প্রাচীন পিরামিড বা আধুনিক সময়ের আকাশচুম্বী বুর্জ-আল-খলিফা জন্ম দিয়েছে হাজারো বিস্ময় বা উন্নত প্রকৌশলে মোড়া রহস্যের। প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক সময়ের ছোট বা জায়ান্ট সব কাঠামো দাঁড়িয়েছে কংক্রিট তৈরির রহস্যকে ঘিরেই। কেমন ছিলো কংক্রিটের এই কয়েক হাজার বছরের ভ্রমণ? কবে? কখন? কিভাবে?

-এই কংক্রিটের ধারনা আমাদের পূর্বপুরুষদের মস্তিষ্কে এসেছে। কাদের হাত ধরেই বা বিস্মৃত মানব সভ্যতায় কংক্রিট আধুনিক সময়ে বিবর্তিত হলো। এসব কিছুই জানবো এই আলোচনায়। চলুন তাহলে সঙ্গী হই কংক্রিটের এই রোমাঞ্চকর ভ্রমণে…

কংক্রিট তৈরির সেকাল একাল

যে কয়টি আবিষ্কার মানব সভ্যতাকে ত্বরান্বিত করেছে তার মধ্যে এই কংক্রিটের ধারনা অন্যতম।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রথম কংক্রিটের ধারনা পায় খ্রীস্টপূর্ব ৬৫০০ সালে প্রাচীণ সিরিয়ান এবং জর্ডানের বাসিন্দাদের হাত ধরে। তাঁরা কংক্রিটের মেঝে এবং কাঠামো বানাতে জানতেন।

তবে ইতিহাস থেকে পাওয়া সবথেকে পুরানো নিদর্শন হচ্ছে মিশরের পিরামিডসমূহ। যা প্রাচীণ সপ্তাশ্চার্যের একটি। পিরামিড তৈরী করা হতো প্রাচীণ ফারাও (প্রাচীণ মিশরের শাসকদের ফারাও বা ফেরাউন নামে ডাকা হতো) রাজাদের কবর বা স্মৃতি স্তম্ভ হিসেবে। সময়ের হিসেবে এটা যিশু খ্রীস্টের জন্মের ৩০০০ থেকে ৫০০০ বছর আগেকার স্মারক। সব থেকে বড় আর বিখ্যাত পিরামিড হচ্ছে ‘দ্যা গ্রেট গিজ্যার পিরামিড’। এটা তৈরীতে ব্যবহৃত একেকটি পাথরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট। ওজন ছিল প্রায় ৬০টন। এরকম প্রায় দুই মিলিয়ন পাথরের সমন্বয়ে তৈরী করা হয়েছে সবথেকে বিখ্যাত আর জায়ান্ট পিরামিড ‘দ্যা গ্রেট গিজ্যার পিরামিড’। পিরামিডগুলো তৈরীতে বড় পাথর খণ্ড জড়ানোর জন্য শুকনো ইটের সাথে মিশে কাঁদা ব্যবহার করা হতো। এছাড়া জমাট বাঁধার জন্য তাঁরা সিমেন্টের বিকল্প জিপসাম মর্টার এবং চুনের মর্টার ব্যবহার করতেন। পিরামিডের সৌন্দর্য্য যতটা মোহবিষ্ঠ করে মানুষকে, ঠিক ততটাই বিস্ময় জাগায় এর অনন্য নির্মাণ কৌশল। যা নিয়ে গবেষণা চলছে এই আধুনিক সময়ে এসেও।

মিশরের পিরামিড
মিশরের পিরামিড

খ্রীস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে ১৬শ শতকে নির্মীত আরেক স্থাপত্য বিস্ময়ের নাম চীনের মহা-প্রাচীর। ২১১৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দেয়াল তৈরীতে ব্যবহৃত হয়েছে পাথর এবং মাটির মিশ্রণ। এছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে পোঁড়া মাটি বা ইট। এই ইটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর গাঁয়ে খোঁদাই করা থাকতো কারিগরের নাম। যার জন্য এই মহাপ্রাচীরের গায়ে লেগে থাকা প্রতিটি ইট ধরে রেখেছে নানা ভাষার বহু অজানা ইতিহাস। বহি শত্রুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষাকল্পে প্রাচীন মিং বংশের রাজারা পরম্পরা ধরে এই গ্রেট ওয়াল নির্মাণ করেছেন। যে পথে পড়েছে দূর্গম পাহাড়,গহীন অরণ্য বা ধূসর মরু। সে সময়ের চীনা প্রকৌশলীরা সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন কঠোর প্রতিজ্ঞায়। প্রায় দুইহাজার বছর ধরে তাঁরা তিলে তিলে তৈরি করেছেন পৃথিবীর এই স্থাপত্য বিস্ময় আর দীর্ঘতম প্রাচীরকে। কয়েকজন মহাকাশচারী, আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র থেকে এই স্থাপনা দেখতে পেয়েছেন বলে জনশ্রুতি আছে। আধুনিক সময়ে এই ‘দ্যা গ্রেটওয়াল অব চায়না’ প্রাচীন সপ্তাশ্চর্য্যের একটি হিসেবে পরিচিত।

দ্যা-গ্রেট-ওয়াল-অফ-চায়না.
দ্যা গ্রেট ওয়াল অফ চায়না

প্রাচীণ রোমানরা অবশ্যই স্থাপত্য বিদ্যার জনক ছিলোনা। তবে স্থাপত্যকৌশল বা কংক্রিট তৈরীর যতকৌশল বর্তমানে প্রচলিত বা অতীতে ছিলো, তার মধ্যে সবথেকে টেকসই এবং ভিন্ন কৌশলের সাথে মানবসভ্যতাকে পরিচয় করিয়ে ছিল প্রাচীন রোমানিয়ানরাই। যেমন: গ্রীকরা প্রবেশদ্বার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল আর তা উন্নত করেছিল রোমানরাই। পরে এ জ্ঞান এবং প্রযুক্তি উন্নত করে রোমানরা সহজে ভাঙবেনা এমনভাবে তৈরী করেছিল বিভিন্ন নালা, রাজপ্রাসাদ, গ্যালারি। রোমান স্থপতি মারকিউস ভিক্রুভিয়াস শক্তিশালী কংক্রিট তৈরিতে ব্যবহার করেছিলেন আগ্নেয় ছাই, সমুদ্রের পানি আর চুন। এই মিশ্রণ একসঙ্গে করে সেগুলো আগ্নেয়গিরির পাথরের সাথে মিশিয়ে সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে রাখতেন। দশবছর পর, এই কংক্রিট থেকে অ্যালমনিয়াম টারবমরাইট নামে দুর্লভ খনিজ তৈরি হত। যা এই কংক্রিটের শক্তিকে বাড়িয়ে দিত আরও। রোমানদের শাসন ছিলো প্রায় দুই হাজার বছর ।

রোমান কংক্রিট
রোমান কংক্রিট

এসময়ে তাঁরা নিজদের বিস্মৃত সম্রাজ্যে অসংখ্য সড়ক ও জনপথ তৈরি করেছিল। ৭০০বছরে ইউরোপের প্রায় ৫৫হাজার মাইল রাস্তা পাকা করেন তাঁরা। এ নির্মাণ এতটাই টেকসই যে, যার কিছু কিছু দুইহাজার বছর পরে টিকে আছে আজও।
৪৭৬ খ্রীস্টাব্দে শেষ রোমান সম্রাট পতনের পরে কংক্রিট তথা স্থাপত্য বিদ্যায় নতুনত্বের খরা ভাব দেখা দেয় । এই ধারা চলতে থাকে ১৪১৪ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। এসময়ে রোমানদের ব্যবহার করা পদ্ধতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থাপত্য বিদ্যাই মানব সভ্যতায় বহমান এবং বিকাশ লাভ করে।
রোমানরা শুধু স্থাপত্য বিদ্যায় পারদর্শিই ছিলোনা; তাঁরা সে বিদ্যা পুঁথিবদ্ধও করে রাখত। তেমন একটা গ্রন্থেই ‘পজুলানা সিমেন্ট’ তৈরির পদ্ধতি লিপিবদ্ধ ছিলো । যার পান্ডুলিপি রোমান সম্রাজ্য বিলুপ্তির সাথে সাথেই হারিয়ে যায় । এটি পুনুরুদ্ধার হয় ১৪১৪ সালে। সে সাথেই পুন:জীবন লাভ করে স্থাপত্য এবং কংক্রিট শিল্প।
এ ধারা হঠাৎই নতুন মাত্রা পায় যখন জন স্মেটন ১৭৯৩ সালে সিমেন্টের জন্য জলবাহী চুন উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি মাটি যুক্ত চুনাপাথর ব্যবহার করেছিলেন , যা আগুনে ছড়িয়ে দেয়া হত যতক্ষন না এটি ক্লিংকারে পরিণত হত। একই ধারায় জেমস ফ্রস্ট নামে এক ব্যক্তি প্রায় একই ধরনের সিমেন্ট তৈরি করেন। তিনি সেটার নাম দেন ‘ব্রিটিশ সিমেন্ট’। পরবর্তিতে ‘জোসেফ আসপোডিন’ ১৮২৪ সালে বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ‘পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট’ আবিষ্কার করেন। যা কংক্রিট বা স্থাপত্য প্রযুক্তিকে নতুন এবং আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে আসে।

১৮৪৯ সালে ‘জোসেফ মনিয়র’ বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ‘রিইনফোর্সড কংক্রিট ‘ (RCC) পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ১৮৫৪ সালে ‘উইলিয়াম উইকসন’ এই পদ্ধতি ব্যবহার করে গৃহায়ন ভবন নির্মাণ করেন। সে পথ ধরেই ১৮৮৯ সালে একই কংক্রিট পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রথম ব্রীজ নির্মাণ করা হয়। এ সময়ের কাছাকাছি ১৮৯১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কংক্রিটের রাস্তা নির্মাণ করা হয়, যা অক্ষত আছে আজও।
প্রযুক্তির উন্নতির ধারায় ১৯০২ সালে ‘অগাস্ট প্যারেট’ প্যারিসে প্রথম আবাসিক ভবন তৈরী করেন ‘স্টীল-রিইনফোর্সড কংক্রিট’ পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ আবাসিক ভবনের নকশা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন প্যারেট নিজেই।
কংক্রিট প্রযুক্তি এরপরে এগিয়েছে খুব দ্রুতই। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ১৯০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহিওতে নির্মীত হয় কংক্রিটের তৈরী প্রথম বহুতল ভবন। এভাবে সময় যত গড়িয়েছে কংক্রিট বিদ্যার বহুমূখী ব্যবহার বিস্মৃত হয়েছে আরও। সময়ের পরিক্রমায় স্থাপত্য প্রযুক্তির কাঁধে চেপে কংক্রিট উঁচু থেকে উঁচুতে উঠেছে। সে পথে বেড়েছে পৃথিবীতে দূষণ ।
এ দূষণ রোদকল্পে তাই মানব সভ্যতা এগিয়েছে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই। একবিংশ শতাব্দির শুরুর বছরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গঠন করা হয় ‘গ্রীণ বিল্ডিং কাউন্সিল’ । সে চেষ্টাতেই ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম সবুজের আচ্ছাদনে সুউচ্চ আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয় ।

মানব সভ্যতার এই সময়ে প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। হাজার হাজার বছরের এই কংক্রিটের ভ্রমণেও লেগেছে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়া। যা বদলে দিয়েছে মানব সভ্যতার স্থাপত্যের সব রীতিনীতি। এখন চাইলেই আমরা গড়ে তুলতে পারি বুর্জ-আল-খলিফার মতন আকাশচুম্বী অট্রালিকা। এবং সেটা খুব অল্প সময়েই।
প্রাচীন সময়ে সব কনস্ট্রাকশন পদ্ধতি ছিলো শারীরিক সক্ষমতা নির্ভর। সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে সেখানেও এসেছে যন্ত্রের ব্যবহার। হাতের মিশ্রণ থেকে কোদাল বা এমন যন্ত্রের ব্যবহার ছিল এর প্রথম ধাপ। আজ একবিংশ শতাব্দীতে কংক্রিট তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। একটি যন্ত্র যা স্বয়ংক্রিয় ভাবেই সব উপকরণ সংগ্রহ করে তৈরি করে স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ কংক্রিট।
কংক্রিট তৈরিতে যন্ত্রের ব্যবহার সভ্যতা গড়তে দিয়েছে অদম্য এক গতি। সেসব যন্ত্র এবং তার ইতিহাস জানবো পরবর্তি কোন আর্টিকেলে। এমন চমকপ্রদ আরও বিষয়ে জানতে Engineers Mirror এর সাথেই থাকুন এবং অবশ্যই থাকুন নিরাপদে।

তথ্য সংগ্রহঃ গিয়াটেক, উইকি, আবাসন বার্তা

লেখায়- নাঈমূল হাছান
সহকারী প্রকৌশলি
মিলন্তিকা ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস
কনটেন্ট ক্রিয়েটর – Engineers Mirror

Leave a Comment

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!